রাজনীতিলিড নিউজ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ক্রয়ডনের মেয়র ও ব্রিটিশ নাগরিক বলায় মহা ক্ষুদ্ধ- বলেছেন ‘কার এত জ্বালা!!

 

এ সময় প্রতিমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন, কোনটা? নেটিজেনরা? কোথায়? জবাবে এক সাংবাদিক বলেন, না, একটা নিউজও হয়েছে…আরেক সাংবাদিক বলেন, ‘ডুয়েল (দ্বৈত) নাগরিকত্ব থাকলে আমাদের মন্ত্রিত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা আছে কি না…’তখন প্রতিমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, কে নিউজ করছে এটা? এ সময় এক সাংবাদিক বলেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) কালকে এটা ভাইরাল…

 

বিশেষ প্রতিনিধি : ব্রিটিশ নাগরিক ক্রয়ডনের মেয়র বলায় ক্ষুদ্ধ হলেন এবার নয়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। শুধু ক্ষুদ্ধ হয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি বলেছেন কার এতা জ্বালা? এরপরেও ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে প্রশ্নের জবাব দেননি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, কে এটা নিয়ে নিউজ করেছে, কার এত জ্বালা? আজ সোমবার ২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি লেবার পার্টি থেকে বেনশাম ম্যানর–এর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্রয়ডনের মেয়র ছিলেন। যা তিনি এখন অস্বীকার করতে না পেরে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে প্রতিয়মান হচ্ছে বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া (বিজেআইএম) এর কাছে।

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘একটা বিষয় উঠেছে, আপনার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব…. ওটা ত্যাগ করেছেন কি না, এ ব্যাপারে আপনার স্টেটমেন্ট দরকার।’ জবাবে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি বাংলাদেশি। এখানে তো বাংলাদেশের… বাংলাদেশি। আমি মনে করি না এমন কেউ আছে যে আমার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বা আমার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করবে। মানে এখানে আসিয়া বাংলাদেশের জন্য কাজ করা মানে তো কোনো সুবিধাবাদী লোক তো আর করবে না।’

বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মাথায় গত শুক্রবার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নতুন পাঁচ মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন কবির টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনি এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

শৈশব থেকে যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা হুমায়ুন কবির দেশটিতে লেবার পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক বলে যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ (রিনাউন্স) করেছেন কি না, তা তাঁরা নিশ্চিত করতে পারেননি। বাংলাদেশ সরকারের সূত্রগুলোও বলছে, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন, এমন তথ্য তাদের কাছে নেই।

সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্য নন, এমন ‘অনধিক এক-দশমাংশ’ (১০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ জনকে) ব্যক্তিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী করা যাবে। তবে সেই ব্যক্তিকে ‘সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য’ হতে হবে। আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে সংবিধানের ৬৬ ধারার ২(গ)-তে উল্লেখ আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।’

হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে। সে প্রসঙ্গ তুলে সাংবাদিক প্রশ্নে বলেন, প্রতিমন্ত্রীর বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বা দেশের প্রতি তাঁর অবস্থান নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু গতকাল নেটিজেনরা (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী) বিষয়টি নিয়ে ঝড় তুলেছেন।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন, কোনটা? নেটিজেনরা? কোথায়?

জবাবে এক সাংবাদিক বলেন, না, একটা নিউজও হয়েছে…

আরেক সাংবাদিক বলেন, ‘ডুয়েল (দ্বৈত) নাগরিকত্ব থাকলে আমাদের মন্ত্রিত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা আছে কি না…’

তখন প্রতিমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, কে নিউজ করছে এটা?

এ সময় এক সাংবাদিক বলেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) কালকে এটা ভাইরাল…

তখন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, আপনি বলেন নেটিজেন! মানে কোন নেটিজেন? আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, কাজ করি। আপনি বলেন নেটিজেন! তো মানে কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা যে মানে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন -ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার? নাকি?’

এ সময় প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়া মানুষসকল, দেশপ্রেমিক মানুষ যারা আছে, দেশের পক্ষে যারা অবস্থান নেয়, এই সমস্ত… যারা মিডিয়া আছে, যারা দেশবাসী আছে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আছে, এখন আমরা সবাই মিলে ইনশা আল্লাহ এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহ বাংলাদেশের-

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ অংশ নিতে চায় বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি না, তা জানতে চান এক সাংবাদিক।জবাবে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘না না, মক্কা ডিফেন্স প্যাক্টে তো আমরা আগ্রহ প্রকাশ করছি। বললাম তো, বাংলাদেশ এখন ইজ আ কান্ট্রি অব রিকগনিশন (বাংলাদেশকে এখন সবাই গুরুত্ব দেয়) এবং একটা আগ্রহ আছে।

যারা আপনার মিডল ইস্টের স্টেকহোল্ডার (মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদার) আছেন, গ্লোবালি যারা মুসলিম ওয়ার্ল্ডে মানে বিভিন্ন কি–স্টেকহোল্ডারস, এখন বাংলাদেশের লিডারশিপ, পার্টিকুলারলি অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার তারেক রহমানের লিডারশিপকে তাঁরা অনেক জায়গায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন টু কাম অ্যান্ড পার্টিসিপেট (আসার জন্য ও অংশগ্রহণ করতে)।’

তা ছাড়া মক্কা নিয়ে সব সময় একটা আলাদা জায়গা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মক্কা বাংলাদেশের হৃদয়ে, মানুষের হৃদয়ে। তো মানে ওখানে আমরা মিডল ইস্টে একটা মানে যদি হয় এমনও যে ইসলামিক নেশনসদের মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে তো আর অস্বাভাবিক না যাওয়া।’

প্রতিমন্ত্রীর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি-তীব্র নিন্দা-

দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির যে জবাব দিয়েছেন, সেটাকে অপেশাদার ও আক্রমণাত্মক আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া (বিজেআইএম)।

আজ সোমবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্য উপযুক্ত নয় এবং মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের কাছ থেকে প্রত্যাশিত পেশাদারত্বের মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারি দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে করা একটি সরাসরি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তিনি সংবাদমাধ্যমকে উপহাস করেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং এমন একটি সময়কে টেনে এনেছেন, যা একটি অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মন্ত্রী মূল প্রশ্নটির কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দেননি। তাঁর বিদ্রূপাত্মক ও আক্রমণাত্মক ভাষা এবং বৈধ প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ইঙ্গিত করা সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখাতে পারে। একই সঙ্গে তা ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সাংবাদিকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।

বিজেআইএমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। হুমায়ুন কবির দীর্ঘদিন ব্রিটেনের রাজনৈতিক জীবন ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি লেবার পার্টি থেকে বেনশাম ম্যানর–এর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্রয়ডনের মেয়র ছিলেন।

আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে বিষয়টি সাংবাদিকেরা তুললে ক্যামেরার সামনে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা যে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার? নাকি?’

বিজেআইএম বলেছে, মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার এমন আচরণ শুধু অশোভন নয়, এটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মৌলিক ভূমিকাকেই ক্ষুণ্ন করে এবং এমন একটি ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে সাংবাদিকেরা স্ব–আরোপিত বিধিনিষেধে বাধ্য হবেন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বৈধ প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত হবেন। অতীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় এ ধরনের প্রবণতা প্রায় সময় দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button