একিউআইএস নজরে বাংলাদেশ-উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একিউআইএস বাংলাদেশকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে সংগঠনটি এখনো জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে
লাবণ্য চৌধুরী : বাংলাদেশকে নিজেদের কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করছে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস)—এমন উদ্বেগের কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংগঠনটি বাংলাদেশে ছোট পরিসরে সেল বা সাংগঠনিক ইউনিট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর আগে ২০১৫ সালের ২ জুলাই আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) বাংলাদেশি প্রধান সমন্বয়কারী ও উপদেষ্টাসহ ১২ জঙ্গিকে আটক করেছিল র্যাব৷ রাজধানী ঢাকার কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
বাংলাদেশকে নিজেদের কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করছে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস)—এমন উদ্বেগের কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংগঠনটি বাংলাদেশে ছোট পরিসরে সেল বা সাংগঠনিক ইউনিট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’ গত ১০ আগস্ট প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্য ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে এতে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার অবস্থান ও সক্ষমতায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংগঠনটির ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা একিউআইএসও আগের তুলনায় আরও সংগঠিত আঞ্চলিক কাঠামোর দিকে এগিয়েছে। একসময় খণ্ডিত অবস্থায় থাকা সংগঠনটি এখন বড় ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেল গঠন, রসদ সংগ্রহ এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
র্যাব এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই সময় জঙ্গিদের কাছ থেকে বিস্ফোরক দ্রব্য, বোমা তৈরির উপকরণ, বিভিন্ন ধরনের ছুরি এবং জিহাদি বই উদ্ধার করা হয় বলে র্যাব জানায়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মুফতি মাইনুল ইসলাম একিউআইএস-এর বাংলাদেশি প্রধান সমন্বয়ক এবং মাওলানা জাফর আমিন উপদেষ্টা৷ আর বাকি ১০ জন সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য৷
তৎকালীন সময়ে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক মাকসুদুল আলম জানিয়েছিলেন, ‘‘মাইনুল ইসলাম একটা সময় হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি) সঙ্গেও জড়িত ছিলেন৷ লেখক অভিজিৎ রায় ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস খুন হওয়ার পর একিউআইএস-এর পক্ষ থেকে দায়িত্ব স্বীকার করে বার্তা দেওয়া হয়েছিল৷”
র্যাব-এর গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছিলেন, ‘‘ওই সময় ঈদের পর রাজধানীতে বড় ধরনের নাশকতা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে চেয়েছিল আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ বাংলাদেশ শাখার জঙ্গিরা৷”। তিনি জানান, ওই দিন বুধবার সকাল সাড়ে ৬টায় রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে জঙ্গি সংগঠন একিউআইএস-র প্রধান সমন্বয়কারী মাইনুল ইসলাম, উপদেষ্টা মুফতি জাফর আমিন, সক্রিয় সদস্য সাইদুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন এবং আব্দুর রহমান বেপারীকে আটক করা হয়৷
এরপর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য আল-আমিন, মোজাহিদুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, আবুল হাশেম, রবিউল ইসলাম এবং হাবিবুল্লাহ আটক হয়৷ পরবর্তীতে তৃতীয় দফায় বুধবার দিবাগত রাত ১টায় মিরপুর-১ নম্বর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৮ বর্ধনবাড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে শহিদুল ইসলাম, আলতাব হোসেনকে আটক করে র্যাব৷
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, একিউআইএসের কার্যক্রমের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে দিল্লির লাল কেল্লায় গত বছরের নভেম্বরে সংঘটিত হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটিকে দায়ী করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদনের একটি অংশে বাংলাদেশে একিউআইএসের ছোট সেল বা সাংগঠনিক ইউনিট প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একিউআইএস বাংলাদেশকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। তবে সংগঠনটি এখনো জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একিউআইএস ‘ইত্তিহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ (আইএমপি)-এর মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই গোষ্ঠী পাকিস্তানে একাধিক হামলার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে গত ৯ মে খাইবারপাখতুনখোয়া প্রদেশের বান্নুতে একটি নিরাপত্তাচৌকির কাছে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও বিস্ফোরকভর্তি যান বিস্ফোরণের ঘটনাও রয়েছে। ওই হামলায় ২১ জন নিহত হন।
জাতিসংঘের স্যাংশনস মনিটরিং টিমের প্রতিবেদনে একিউআইএসের নেতৃত্বের অবস্থান নিয়েও তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের তালেবান সরকারের দেওয়া ‘তাজকিরা’ পরিচয়পত্র রয়েছে। বিষয়টিকে তালেবান ও একিউআইএসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো।
মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তপারের হামলা ও সংঘাত অব্যাহত থাকায় এ অঞ্চলে উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান। তালেবান সরকার তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে তালেবান সরকার।
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আশঙ্কা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নতুন করে কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। এর ফলে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকারী দল।



