‘হিডেন সুপারস্টার’ শামস সুমনের জন্যে জয়ের আর্তনাদ-

তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘জয়যাত্রা’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’ ইত্যাদি। শামস সুমনকে তাঁর নিজ শহর রাজশাহীতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।
লাবণ্য চৌধুরী : ‘হিডেন সুপারস্টার’ শামস সুমনের জন্যে জয়ের আর্তনাদ-ছিল তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে। শামস সুমনের মৃত্যুতে ভেঙে চৌচির শাহরিয়ার নাজিম জয়। বন্ধুকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছেন অসীম ভালোবাসার কথা।মৃত্যুর আগে তীব্র অর্থকষ্টে কেটেছে শামস সুমনের জীবন— সহশিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয়ের সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক পোস্টে এমন কথাই বলে গেছেন অকাতরে। শামস সুমন গত ১৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।
জয়ের স্মৃতিচারণ:
জয় লিখেছেন যে, শামস সুমন ছিলেন এমন একজন অভিনেতা যাকে নাট্যদলগুলো টাকার বিনিময়ে অভিনয়ের জন্য ডাকত, কারণ চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি ছিলেন অপরিহার্য। তাঁরা ২০০০ থেকে ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত একসাথে অসংখ্য নাটক করেছেন এবং ইন্দোনেশিয়ায় শুটিংয়ের সময়ও তাঁদের অনেক স্মৃতি রয়েছে।
অর্থকষ্ট ও আক্ষেপ:
মৃত্যুর আগে এই অভিনেতা প্রচণ্ড অর্থকষ্টে ছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে। ফেসবুকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে আজকাল তাঁকে কেউ অভিনয়ের জন্য ডাকেন না।
পুরস্কার ও অবদান:
২০০৮ সালে শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘স্বপ্নপূরণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (পার্শ্বচরিত্র) লাভ করেন। এছাড়া তিনি রেডিও ভূমি-র স্টেশন প্রধান এবং চ্যানেল আই-এর অনুষ্ঠান বিভাগের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য কাজ: তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘জয়যাত্রা’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’ ইত্যাদি। শামস সুমনকে তাঁর নিজ শহর রাজশাহীতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।
ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে জয় লিখেছেন
মধ্যরাতে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন তিনি। যেন প্রয়াত সুমনের কাছে লেখা তার খোলা চিঠি। সেই চিঠিতে তাদের ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্বের কথা লেখা হয়েছে। তার চিঠি থেকে বোঝা যায়, ভীষণ অর্থকষ্ট ও মনকষ্টে ভুগছিলেন শামস সুমন।
জয় লিখেছেন— তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম শাহবাগে পিজি হাসপাতালের সামনে। মহিলা সমিতিতে তোমার মঞ্চনাটকের বলিষ্ঠ অভিনয়, শুদ্ধ কণ্ঠস্বর আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই সময় আমি নাট্যজনে সাধারণ নাট্যকর্মী হিসেবে ছিলাম। একটা জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে নাট্যজন তোমাকে টাকার বিনিময়ে চরিত্রের রূপায়ণের জন্য ডাকতে। কারণ ওই চরিত্রে তুমি ছিলে অপরিহার্য।
তিনি বলেন, আমি ভাবতাম সবাই টাকা খরচ করে অভিনয় করে। অথচ তোমাকে টাকা দিয়ে অভিনয় করায়— কত বড় অভিনেতা তুমি? তার পর ধীরে ধীরে তোমার সাথে নাটকের অভিনয় দেখা হয়, বন্ধুত্ব হয়। বয়সে ছোট হলেও তুমি বন্ধুত্ব করে নাও আমার সাথে।
অভিনেতা শামস সুমন ও শাহরিয়ার নাজিম হয় একত্রে অনেক নাটক করেছেন। সেসব স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা একবার ইন্দোনেশিয়া যাই, ফ্লোরিং করে একসাথে দুজন ঘুমাই। একটা বিশেষ কারণে দুজন দুপাশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে একসাথে হেসে দিই। কারণ দুজনের মনেই একটা বিষয় কাজ করছিল, সেই বিষয়টি না হয় না-ই বললাম।
তিনি বলেন, শুধু তুমি আর আমি তা। বিশাল বড় স্ক্রিপ্ট এবং ক্যারেক্টার বিপুল রায়হানকে প্লেনের ভেতরে কনভিন্স করে ছোট করে ফেলি তুমি এবং আমি। কারণ বিদেশে অভিনয়ে যেন আমাদের প্রেশার না পড়ে, আমরা যেন অল্প কাজ করে বেশি আনন্দ করতে পারি। তারপর ঢাকায় টেলিভিশন নাটকে যেখানে তুমি সেখানে আমি। এত এত নাটক একসাথে করেছি…। প্রায়ই তুমি বলতে— আমরা একজন মরলে আরেকজনকে দেখা যাবে। কারণ সব কাজই একসাথে সেই ২০০০ থেকে ২০০৪-০৫ পর্যন্ত।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চ্যানেল আইয়ে শাহরিয়ার নাজিম জয়ের উপস্থাপনায় ‘১৩টি প্রশ্ন’ অনুষ্ঠানে প্রচার করা হয় শামস সুমনের শেষ সাক্ষাৎকার। প্রয়াত বন্ধু ও সহকর্মীর প্রতি জয়ের এমন আবেগঘন চিঠি বিনোদন অঙ্গন ও অনুরাগী মহলকে করেছে আবেগাপ্লুত।
হতাশায় ডুবে ছিলেন শামস সুমন। যাপন করতেন নিঃসঙ্গ জীবন। সে প্রসঙ্গে এ উপস্থাপক লিখেছেন— শেষের দিকে তোমার সঙ্গে যখন কথা হতো, আমি তোমার কাছ থেকে শুধু হতাশার কথা শুনতাম। আমি তোমাকে সাহস দেওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এবং বোঝাতে চেষ্টা করতাম— তুমি জীবনটাকে এত হালকাভাবে নিচ্ছ কেন? তুমি সিরিয়াস হচ্ছ না কেন? তুমি কাজের প্রতি আরও বেশি ডেডিকেটেড হচ্ছ না কেন? আমার সেই কেনর উত্তর তুমি শুধু হাসি দিয়েই উড়িয়ে দিতে।
তিনি আরও বলেন, তোমার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের গল্প আমাকে সব খুলে বলেছিলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন তুমি টানাপোড়েন থেকে বের হতে পারছ না। তুমি আমাকে বলেছ— তুমি চেষ্টা করছ, পারছ না। কিন্তু না পারতে পারতে মানসিক চাপ নিতে নিতে তুমি যে চোখের সামনে এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে, আমি অনুমান করলেও এটা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবিনি।
জয় আরও বলেন, তোমার জীবন থেকে যা শিখলাম, পৃথিবীতে তুমি যত কাজ কর না কেন, যত সম্মান অর্জন কর না কেন, তোমার যা টাকা লাগবে তা যদি তোমার কাছে না থাকে, তাহলে তুমি সত্যিই মানসিক চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আমি জানি, তোমার বেলায় তাই হয়েছে। বাচ্চাদের জন্য তোমার অনেক চিন্তা ছিল। তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তুমি তা জোগাড় করতে পারছিলে না। তোমার ফ্যামিলি লন্ডনে থাকে, তারা চেয়েছিল তুমি লন্ডন চলে যাও। কিন্তু তুমি দেশ ছেড়ে যাবে না। এ নিয়ে ছিলে এক বিশাল দ্বন্দ্ব। সবাই চলে গেল। তুমি একা রয়ে গেলে রেডিও ভূমিতে এবং মাতৃভূমিতে।
এ অভিনেতা বলেন, তোমার বয়সে পুরুষ একা থাকতে পারে না। থাকবেই বা কেন? একা থাকার জন্য তো সে জীবনের শুরুতে সংসার শুরু করেনি। একা থাকার জন্য সে সমস্ত রোজগার সংসারের জন্য ব্যয় করেনি। সবাই সবার ভবিষ্যতের জন্য, উন্নত জীবনের জন্য যার যার গন্তব্যে চলে গেছে। আর তুমি তাদের সবকিছু দিয়ে একা একা স্যাক্রিফাইস করেছ।
এ উপস্থাপক আরও বলেন, খাবার অসুবিধা, লোকের অসুবিধা, টাকার অসুবিধা— এত অসুবিধা নিয়ে ৬০ বছর বয়সে বাঁচা কি সম্ভব? না সুমন ভাই। সম্ভব না। কারো কোনো দোষ নেই, ভাবীরও নেই, বাচ্চাদেরও নেই, তোমারও নেই। দোষ তোমার ভাগ্যের। দোষ তোমার দেশপ্রেমের।
শাহরিয়ার নাজিম জয় বলেন, লন্ডন চলে গেলে তুমি তো অনেক উন্নত জীবন পেতে। কিন্তু যাওনি, এখানে এই মাটিতে এই বাতাসে তুমি থাকতে চেয়েছ। এখানেই থাকলে, এখানেই মরলে। মাতৃভূমি, রেডিও ভূমি এরপর মাটির ভূমি। সেখানেই তুমি ঘুমাও ভাই। তোমার আর কোনো দায়িত্ব নাই। আর আসতে হবে না চ্যানেল আইয়ে। আর ফিরতে হবে না ঘরে। আর কোনো টেনশন করতে হবে না। টাকার কথা ভাবতে হবে না।
তিনি বলেন, তোমার জীবন থেকে আমি শিখলাম— জীবন ছোট। একমুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না। একমুহূর্ত নিজেকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। জীবনের প্রয়োজনের যে টাকা, সেই টাকার জোগাড় অবশ্যই করে রাখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তোমার মতো সবার প্রিয় আমি হতে পারব না। সেই সামর্থ্য আমার নাই। কিন্তু তোমার মতো নিজেকে কষ্ট আমি দেব না। বুঝে গেছি ভাই। তুমি বুঝিয়ে গেছ, নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না।
‘হিডেন সুপারস্টার’ উল্লেখ করে এ অভিনেতা বলেন, সুমন ভাই, তোমার মৃত্যুর পর কিন্তু তুমি অনেক সম্মান পেয়েছ। ফেসবুক খোলা যাচ্ছে না, শুধু তোমার সংবাদ। তুমি না বলতে, তুমি খুবই অ্যাভারেজ; কিন্তু কই সুমন ভাই, আমার তো মনে হচ্ছে একজন সুপারস্টারের মৃত্যু হয়েছে। তুমি একজন হিডেন সুপারস্টার। তুমি বেঁচে থাকতে আমি তা বুঝি নাই। হে সুপারস্টার, মহান আল্লাহ তোমার আত্মাকে শান্তিতে রাখুক। ঘুমাইয়া থাকো ভাই। আরামে ও নিশ্চিন্তে থাকো।



