ভূমিকম্পে রাজধানীসহ সারাদেশে নিহত ১০-আহত সাড়ে ৪০০

শুক্রবার রাত পর্যন্ত দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট সাড়ে চার শতাধিক মানুষের বেশি আহত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহত ১৬ জনকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার : স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মিটফোর্ড হাসপাতালে মর্গের সামনে নিহত আব্দুর রহিম ও আব্দুল আজিজ রিমনের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যাচ্ছিল। একই অবস্থা বিরাজ করছিল নরসিংদীতে এবং নারায়নগঞ্জেও। বাবা-ছেলেসহ নরসিংদীতে নিহত হয়েছেন ৫ জন। সর্বত্রই আহাজারি বিরাজ করছিল।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যমতে ১০ জন নিহত এবং সাড়ে ৪ শতাধিক আহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত পর্যন্ত দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট সাড়ে চার শতাধিক মানুষের বেশি আহত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহত ১৬ জনকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
শিশু ফাতেমার করুণ মৃত্যু-
শুক্রবার সকালে ভূমিকম্প শুরু হলে ১০ মাস বয়সী মেয়ে ফাতেমাকে কোলে নিয়ে নুজাইবার কাছে যাচ্ছিলেন কুলসুম। বাড়ি থেকে বেরোতেই সড়কের পাশে ধসে পড়া দেয়ালের নিচে চাপা পড়েন মা-মেয়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় ১০ মাসের ফাতেমা। শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ইসলামবাগ ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফাতেমা ওই এলাকার আবদুল হকের মেয়ে।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের দিকে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী। এটি একটি মাঝারি শ্রেণির ভূমিকম্প।এদিকে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিস) বলছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশাল।
ভূমিকম্পের ফলে ভেঙ্গে পড়ে বিভিন্ন স্থাপনা, হেলে পড়ে বড় বড় ভবন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে চার শতাধিক মানুষের বেশি। আহতরা দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।তবে এর বাইরেও বহু রোগী দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং কোথাও কোথাও ভর্তি রয়েছেন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই তথ্য এখনো হালনাগাদকৃত তথ্যে যুক্ত হয়নি। ফলে মোট আহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত সাড়ে চার শ’র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার। তিনি জানান, ‘সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে ভবনের ধস, দেয়াল ভাঙা ও আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি-জনিত ঘটনায় অধিকাংশ আহতের খবর এসেছে। নরসিংদীর মাধবদীতে উৎপত্তি হওয়া ওই কম্পনে সারাদেশে ১০ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজধানীর বংশালের কসাইটুলী এলাকায় একটি পাঁচ তলা ভবনের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে তিন পথচারী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন বাবা-ছেলে বলে জানা গেছে। তারা হলেন হাজি আব্দুল রহিম (৪৭) এবং মেহরাব হোসেন রিমন (১৩)। এছাড়া মায়ের সঙ্গে বাজার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফি। তার মা নুসরাত গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন।বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া রাজধানীর মুগদার মদিনা বাগে ভূমিকম্পে নির্মাণাধীন ভবনের রেলিং ধসে পড়ে মাকসুদ (৫০) নামের এক নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।
দেয়াল চাপায় শিশু নিহত নারায়ণগঞ্জে
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমিকম্পের সময় একটি টিনশেড বাড়ির দেয়াল ধসে পড়ে ফাতেমা নামে এক বছর বয়সি শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশুটির মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগম আহত হন। নিহত ফাতেমা গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ইসলামবাগ এলাকার আব্দুল হকের মেয়ে।
বাবা-ছেলেসহ নিহত ৫ নরসিংদীতে
নরসিংদীর সদর উপজেলার গাবতলী এলাকায় ভূমিকম্পের সময় বাড়ির সানশেড ভেঙে পড়ে হাফেজ ওমর (১০) নামে এক শিশু প্রাণ হারিয়েছে। একই ঘটনায় ওমরের বাবা দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বলও চিকিৎসাধীন অবস্থা মারা গেছেন।ওমরের চাচা জাকির হোসেন বলেন, ভূমিকম্প শুরু হলে দেলোয়ার হোসেন তিন সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখনই সানশেড ভেঙে পড়ে তাদের ওপর। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে বাবা ও ছেলেকে ঢামেকে আনা হলে চিকিৎসক ওমরকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে দেলোয়ারও মারা যান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মালিতা গ্রামে ভূমিকম্পে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে কাজেম আলী ভূঁইয়া (৭৫) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। এছাড়া কাজীরচর নয়াপাড়া গ্রামের মৃত সিরাজ উদ্দিনের ছেলে নাসির উদ্দিন (৬৫) এবং শিবপুরের জয়নগর ইউনিয়নের আজকীতলা গ্রামের ফোরকান মিয়াও (৪৫) ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন।



