রাজনীতিলিড নিউজ

‘অসুর মরার আগে দাড়ি-চুল কাটেনি’ কে লাগালো অসুরের মুখে দাড়ি তা খতিয়ে দেখছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

 

অসুরের দাড়ি সম্পর্কে কুষ্ঠিয়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জয়দেব বিশ্বাস বলেন, ‘এটা হাজার বছরের ঐতিহ্যের বিষয়। শাস্ত্র অনুযায়ী অসুর মরার আগে দাড়ি-চুল কাটেনি।

বিশেষ প্রতিনিধি : এবারের শারদীয় দুর্গাপূজায় সারা দেশে ৭৯৩টি পূজামণ্ডপে অসুরের মুখে দাড়ি লাগানোর ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। অনুসন্ধান চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
রোববার ৫ অক্টোবর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথাগুলো বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

অসুরের দাড়ি সম্পর্কে কুষ্ঠিয়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জয়দেব বিশ্বাস বলেন, ‘এটা হাজার বছরের ঐতিহ্যের বিষয়। শাস্ত্র অনুযায়ী অসুর মরার আগে দাড়ি-চুল কাটেনি।

অসুরের দাড়ি সম্পর্কে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এসব ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদের জানানো হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে সহযোগিতা করছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে জিডি করা হয়েছে। কারা কারা এ ঘটনায় জড়িত, সে অনুসন্ধান চলছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ধর্ষণের অভিযোগ তুলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করা এবং দুর্গাপূজার মণ্ডপে অসুরের মুখে দাড়ি লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চক্রান্ত হয়েছিল। এ চক্রান্তের পেছনে ফ্যাসিস্টের দোসরদের মদদ ছিল, যা ইতিমধ্যে প্রতীয়মান হয়েছে।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, পার্শ্ববর্তী একটি দেশে প্রতিমা তৈরির সময় প্রধান উপদেষ্টাকে নিন্দনীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে এখানে অসুরের মুখে দাড়ি লাগানোর কাজটিতে তাদের যোগসূত্র দেখা যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারি ও দুর্গাপূজার জন্য গঠিত কমিটির সহযোগিতায় কুচক্রীদের চক্রান্ত সরকার নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে এত তুলকালাম, সে ঘটনার মেডিকেল প্রতিবেদনে আলামতই পাওয়া যায়নি। সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পাহাড়ি-বাঙালির সহযোগিতায় সুষ্ঠুভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা গেছে। এরই মধ্যে পার্বত্য জেলায় অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ১৪৪ ধারাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ফ্যাসিস্ট ও তাদের সহযোগীরা কয়েকটি পূজামণ্ডপে অসুরের মুখে দাড়ি লাগিয়ে ধর্মীয় বিভেদ, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সহিংসতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করেছিল। এ ঘটনায় কিছু ফ্যাসিস্ট বুদ্ধিজীবীর ইন্ধনও ছিল। কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। গতবারের মতো এবারও শান্তিপূর্ণভাবে, নির্বিঘ্নে উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে।

বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

অসুরের দাড়ি সম্পর্ক ও নেপথ্য ঘটনা-

কুষ্টিয়ায় দুর্গাপূজার প্রতিমায় অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে অসুরের মুখ গামছা বা লাল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ছবিগুলো কুষ্টিয়ার মণ্ডপের বলে দাবি করা হলেও জেলা প্রশাসক (ডিসি) এটিকে সম্পূর্ণ অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর মন্দির পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিন বলেন, ‘প্রতিমা নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এতে মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তবে পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে- প্রয়োজনে প্রতিমায় সংশোধন করার নির্দেশনা তারাই দিয়েছেন। প্রশাসন, পূজা উদযাপন কমিটি, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ সবার সঙ্গে পরামর্শ করেই বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে।’

এদিকে কুষ্টিয়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের দাবি, কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদ সম্প্রতি এক বিবৃতিতে সারাদেশের কিছু প্রতিমায় অসুরকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। সেখানে সামাজিক উত্তেজনা এড়াতে অসুরের দাড়ি অবমুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এই নির্দেশনার পর জেলা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কুষ্টিয়ার ৩৯টি পূজাম-পে অসুরের মুখ থেকে দাড়ি ঢেকে রাখা হবে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদ যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে।

ঘটনা সম্পর্কে মিললাইন ফুলবাগান হরিজন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুকলাল জানান, রোববার রাতে স্থানীয় এক এসআই এসে তাকে নির্দেশ দেন অসুরের মুখের দাড়ি সরিয়ে ফেলতে। আপাতত কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে বলা হয়। পরে তিনি বাড়ি থেকে গামছা এনে মুখ ঢেকে রাখেন। সকালে আবার সেটি খোলা হয়।

জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক দেবেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকা শিল্পীর নিজস্ব কল্পনার বহিঃপ্রকাশ। হিন্দু শাস্ত্রে বহু ঋষি-মুনি দাড়ি রাখতেন। অসুরের মুখে দাড়ি নতুন কিছু নয়। বরং কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে বিতর্কিত করেছে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টের জন্য।’ তবে তিনি ফেসবুকে এ বিষয়ে দেওয়া নিজের একটি পোস্ট পরে সরিয়ে নেন।

এই বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করেছি। যাতে কোনোভাবেই সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট না হয়, সে কারণেই বিভিন্ন মণ্ডপে গিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

অপরদিকে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জয়দেব বিশ্বাস বলেন, ‘এটা হাজার বছরের ঐতিহ্যের বিষয়। শাস্ত্র অনুযায়ী অসুর মরার আগে দাড়ি-চুল কাটেনি। অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকা নতুন কোনো প্রথা নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরির কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
গতকাল বুধবার সরেজমিনে কুষ্টিয়ার থানাপাড়া পূজা ম-পে গিয়ে দেখা যায়, সুষ্ঠুভাবে সকলবিধি মেনে নবমীর আচার-অনুষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার সুধীমহল জানান, কুষ্টিয়ায় দুর্গাপূজার প্রতিমায় অসুরের মুখে দাড়ি-গোঁফ আঁকা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক ছড়ালেও প্রশাসন, পূজা উদযাপন পরিষদ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী একযোগে পদক্ষেপ নিয়ে বিষয়টি সমাধান করেছে। যা একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয়।প্রশাসনের দাবি, এটি ছিল উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার, যা শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

 

 

 

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button